ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে গাজা দখলে নিয়ে ভূখণ্ডটিকে পুনর্গঠন করার যে পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তার বিকল্প হিসাবেই দেখা হচ্ছিল আরবদের এই পরিকল্পনাকে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের জন্য আরব দেশগুলোর দেওয়া পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এ পরিকল্পনায় ২১ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের নিজ ভূমিতে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তুচ্যুতি এড়ানো হয়েছিল।
মঙ্গলবার মিশরের রাজধানী কায়রোয় আরব নেতাদের এক জরুরি সম্মেলনে পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হয়।ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে গাজা দখলে নিয়ে ভূখণ্ডটিকে পুনর্গঠন করার যে পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তার বিকল্প হিসাবেই দেখা হচ্ছিল আরবদের এই পরিকল্পনাকে।
ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (পিএ) ও হামাস আরব দেশগুলোর এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানালেও হোয়াইট হাউজ ও ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এ পরিকল্পনায় গাজার বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষিত হয়েছে। ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে উভয়ই।আরব নেতাদের সম্মেলনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হল, যখন গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ছয় সপ্তাহের প্রথম দফার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইসরায়েল গাজায় ত্রাণ সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, যাতে হামাস যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ সাময়িক বাড়ানোর নতুন প্রস্তাব মেনে নেয়। আর এই সময়ে গাজা থেকে আরও কিছু জিম্মি মুক্তি পেতে পারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময়ে।
তবে হামাস জানিয়েছে যুদ্ধবিরতি চুক্তির যে শর্ত ছিল তা মেনেই দ্বিতীয় ধাপ শুরু করতে হবে, যার লক্ষ্য হবে যুদ্ধের সমাপ্তি ও ইসরায়েলি সেনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার।মঙ্গলবারের জরুরি আরব সম্মেলনে গাজার জন্য ৫,৩০০ কোটি ডলারের মিশরীয় এক পুনর্গঠন পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন আরব নেতারা।
এ পরিকল্পনার অধীনে তিনটি ধাপে পাঁচ বছরের মধ্যে গাজা পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ছয় মাসে ৩০০ কোটি ডলার ব্যয়ে ধ্বংসস্তূপ ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ সরানো হবে।
দ্বিতীয় ধাপে দুই বছরে ২,০০০ কোটি ডলার ব্যয়ে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও পানিসহ মৌলিক সেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।আর তৃতীয় ধাপে আরও দুই বছরে ৩,০০০ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি বিমানবন্দর, দুটি সমুদ্রবন্দর এবং একটি শিল্প এলাকা নির্মাণ করা হবে।
এ পরিকল্পনায় একটি স্বাধীন প্রশাসনিক কমিটি গঠনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা গাজা পরিচালনা করবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ধাপে ধাপে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবে।ওদিকে, আরব নেতাদের সম্মেলনের চূড়ান্ত খসড়া প্রজ্ঞাপন রয়টার্স দেখেছে, তাতে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের পুরোপুরি বাস্তুচ্যুত করার মার্কিন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র ব্রায়ান হিউজেস এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, “আরব পরিকল্পনায় গাজার বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা করা হয়েছে।অঞ্চলটি বর্তমানে বসবাসের অনুপযোগী, এবং ধ্বংসস্তূপ ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদে পূর্ণ এলাকায় বসবাস করা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “হামাসমুক্ত গাজা পুনর্গঠনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পরিকল্পনায় অটল রয়েছেন। আমরা এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে আরও আলোচনার অপেক্ষায় আছি।”কিন্তু ট্রাম্পের গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে শঙ্কা মিশর, জর্ডান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর।
ট্রাম্পের প্রকল্পের বিকল্প কী হতে পারে, তা নিয়ে এই আরব রাষ্ট্রগুলো প্রায় এক মাস ধরে আলোচনা করছিল।আরব লীগের সহকারী মহাসচিব হোসাম জাকি বিবিসি-কে বলেন, “ট্রাম্পের পরিকল্পনা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি ফিলিস্তিনিদের জোর করে তাদের বাড়িঘর ও ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। আমরা বারবার বলেছি, মানবসৃষ্ট এই সংকট মোকাবেলায় এটি কোনো সমাধান হতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “এই যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা, এবং ইসরায়েল সেই উদ্দেশ্যই বাস্তবায়ন করছে।”একইসঙ্গে তিনি ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়াকে “মানবতা ও নৈতিকতার পরিপন্থি” বলে মন্তব্য করেন।
ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছে, তারা আবারও "নাকবা"-র (আরবি শব্দ, অর্থ "বিপর্যয়") পুনরাবৃত্তির শিকার হবে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে লাখো ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল।সে সময় বহু শরণার্থী গাজায় আশ্রয় নেয়। গাজার বেশিরভাগ জনগণ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, এবং খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।